মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২০

এমন একটা নেমন্তন্ন

 তুমি এসো আমার বাড়ি

খেতে দেবো এক খিলি পান

বসতে দেবো পিঁড়ি

মাথার ওপর ছন্

আর কাদায়লেপা মাটি

এইতো আমার সদোর পরিপাটি।।


বৃষ্টি এলে জানলা দিয়ে?

মাটি-মাটি গন্ধ মেলে

বাহির করে মুখটি তুমি

পেতো হৃদয় ঢেলে।


কাছেই কোথাও বেশ-দূর-নয়

এমন দূরে দিঘী আছে

বারোয়ারি।।

আমকাঁঠালের ভিড় ঠেলে

পাতাগুলোয় মাখামাখি

মধুর মাছির দাপাদাপি

গন্ধে বিভোর আঙ্গিনাতে

মিঠে কুয়োর স্বচ্ছ পানি।



আর কিছু নয় 

চাটাই পেতে গাভীর চোখে

চোখ রেখে

ভাবছো তুমি অলস জীবন

অম্নি তোমার কোলের উপর

ছাগলছানার হুমড়ি খাওয়া

আদর সোহাগ ভাবছো পাছে?

ও এদের দস্যিপনা।



বেশ কয়টা লতানে গাছ

সব্জিফুলশাকের ঢেঁড়ে

বেড়ে ওঠা গুচ্ছ সুখ পুচ্ছ আমেজ।

চোখের কোণে ঠোঁটের ভাঁজে সে

হাসি হয়ে কচি সবুজ।



গেল বছর উমা এলো?

চালের গুঁড়ির আল্পনাতে

ঘর বেঁধেছি।

দুধ সাদা কল্কি গুলো 

শান্তি চোখে উঠোন জুড়ে।

না গো না শিল্পী নই

এই একটু উমার জন্য 

আয়েশ করে পিঠে পুলি।

নারকোলের চিড়েভাজা

কয় রকমের মাছের ভাজা।

খেলোও সেবার ঠাকুরেরা

আসনের নয়কো শুধু

বাড়ি বয়ে চলতি আসা

অতিথিদের পদার্পণে

এদিক সেদিক

হুলূস্হুলে।



এ ঘর ওঘর পায়ে পায়ে

আলতা সেজে সিঁদুর মেখে

ধূপ ধুনোর কুয়াশা তলা

ঢাকের বাদ্যে কানেতালা

হাসি আবীর প্রসাদ

প্রদীপ আতশ ফুলঝুরিতে

আশীর্বাদে স্নেহ মার্জনায়

পেটুক ছেলের বাড়তি লাড্ডু

পুজোর দিনে ঘাটেহারা সাপলুডু


গোধূলির অস্তরাগে

মন্ডপের খুশীর ভীড়ে

দূর্গা নামের একই মেয়ের

শত শত রূপ


কত অঙ্গে রঙ ঢঙে

রঙিন বেলুন ফানুস

প্যাঁড়া সন্দেশ মিষ্টি দইয়ে

ভোগের খাবার বাড়তে যেতে,

খাইয়ে দিতে। 

দশ হাতে তার আগলে রাখা।


সবই হল

এলো যেমন ত্রস্ত পায়ে

চলেও গেল।

কিন্তু এই নিরোন উঠোন

আল্পনাতে ছোট্ট গৃহের

বুকের 'পরে 

খেলে বেড়ায়

যে বাতাস খানি

দরজার পর্দা ওড়ে

আঙিনায় কাপড় নাচে

সেই সাথে পেখম মেলে

পরম নামের মোরগখানা।


এসো তুমি যেমনি পারো

আমার ঘরের দাওয়ায় বসো

একটুখানি জিরুতে এসো

ঠিক একফালি এত টুকুন

ঘরকন্নায় 

এক আকাশ জায়গা মেলে।

এসো তুমি।

এলে পরে কুয়োর অমন ঠান্ডা জলে

মন ভিজিও।

পুঁইয়ের পাতার ছায়ায় ভরা

উনুনপারেধোঁয়াওঠা 

এক বাটি দুধ

ঢাকা রইলো।


এসে পড়ো ইচ্ছে হলেই

গ্রামের পথের পাকুড়

গাছের বাঁ দিকে যে

কাঁচা রাস্তা

সর্ষে ক্ষেতের আল বরাবর?



ওই যে দূরে ছনের বাড়ী

তার মাটির দেয়াল

ঘর দুয়োর।।

আল্পনাতে

লাউয়ের বেড়ার

জংলা মতন।।

কচি সবুজ লতানে ঝাড়।

চিনলে তো খুব?

আসছো তবে?


তারার উঠোন মাথায় নিয়ে

হ্যাঁজাক জ্বেলে পথ চাইবো

বলছো তুমি?

সেবার মেলায় কেনা

গিরিবাজটা বাবা হবে

সাদা সাদা ছোট্ট কিছু

ডিম জমেছে।

দিনরাত সে কি তার পাহারাদারী!


এলে পরে হলদেটে লাল 

আগুন জ্বেলে

গভীর নীল রাতের আকাশ

হাজার তারায়ও

কতটা একা,

দেখতে পাবে।


আমাদের উঠোন জুড়ে

চাদর গায়ে 

হিম আকাশের বরণখানি

এক আসমানে হাজার বুটি


আসছো তবে?

এলেই তুমি

অতিথি মোর

পরম যত্নে আপন হবে।।












বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২০

তুমি গিয়েছিলে জলে?


এ জীবন আমার
আমারে শিখায়ে লয়ে চলে
আমার-ই গীত।।

ঘন জলের দেয়াল।
কোলাহলের আবছা আওয়াজ
ভেসে আসে ভোঁতা ।

কান পাতি। পাতি না
চোখে দেখি, দেখিনা
অবশ  নিশ্চিন্ত
ঘুম জড়ানিয়া তরল
কেটে চলি নিজ মনে।

 বুদ্ বুদ্ ।
ধীর ধীর
আবছায়া।


তুমি ডুবিলা কি ডুবিলা না
নীরের আলোক-আঁধার।
ভাসিয়াও দেখিলানা।
চুপি চুপি,
তোমার ভেতর
কে কাটে অমন এক মনে 
ডুব সাঁতার ?




সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২০

নিশাচর

গভীর নিঝ্ঝুম জ্যোৎস্না।
চাঁদ- সে যত কার্তিক ঠাকুর
হয়ে ছড়ায় তার বন্যা -


নিশুতের চির জাগানিয়া
তক্ষক-মনের নেশা
আড়মোড়া দিয়ে ভেঙ্গে -
ততো  আমায় ডাকে।


এক চিলতে শান্তি
আর বহুদিনের সাথী
দুটো-কদম-ফেলার পা,
নিয়ে নামি আমি পথে।

নিশীথের জ্যোৎস্না ধোয়া
জঙ্গলের কোলাস্জ
কি কথায় ওঠে হেসে?
আমারে টেনে নেয়
বুঁদ জোনাকী আর
লজ্জাবতীর দেশে।

যেখানে- বুনো দিঘী
লুকোচুরি খেলে
বুনো হাঁসের সংসারের
বাসে ।

আহা কি সে ঘোর !

শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২০

কখনো কি নিজের সঙ্গে প্রেম করেছো ? করেই দেখো।

এরপর হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে
নিজের সঙ্গে আমার দেখা ।

দুজনেই চমকে গেছি ।
আমি আবার ইচ্ছে হলেই
ছয় হচ্ছি ।
১২ হচ্ছি ।
কলজে ভরে ঘ্রাণ নিচ্ছি ।
রোদ তাপানো
দুপুর ছাদের ।



মাড় দেয়া মায়ের আঁচল
সুখ ছড়াচ্ছে ছাদের হাওয়ায় ।


আমি তখন কেউ-দেখেনি
এই আমেজে, তারের নিচে
মায়ের নেড়ে রাখা
মাড় ধোয়ানো মা-গন্ধে
ডুবে গিয়ে চোখ বন্ধে
মা-মা ঠাণ্ডা কুলফি
আবর্ততে মগ্ন আছি ।


একদিন ১২ বলে,
কেমন কেমন
একলা হবার দিন গুনছি।


আমার আমি অবাক হয়ে
চেয়েই রইলো আমার দিকে ।
চেয়েই আছে নিস্পলকে
চোখের কোলে স্নেহ মেখে ।


এই আমিটা কেমন আমি ?
কই ঠিক আমি তো নই।
আমার মতই।
আমি-আমি তবু
ঠিক এই আমি নই।


বরং কেমন শান্ত ধীর ।
কথা শুনছে ।
মন বুঝছে ।
জেনে বুঝে সব, মেনে নিচ্ছে।


গোধূলি বেলায় , বেলার বালির
তির-তির-তির ঢেউয়ের ভিতর
পা ডুবিয়ে যেমন আমি
ডুবে যাওয়া সূয্যি সাজি,
আবীর মাখা জলের কোলাজ
আকাশটাতেও মাখামাখি।


ঠিক তখনি আপন আপন গন্ধ নিয়ে
আমার-আমি আমায় তখন আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে ।
বুকে জড়িয়ে বলে চলে-
" এই এখুনি যা দেখছিস, সূয্যি মামা,
আবীরমাখা আকাশ আলোয়
কুসুম নরম বুকের কথা,
সব সত্যি ।
যা হচ্ছে সব সত্যি ।"



আবার কেমন এক নিমিষেই
ঝুপ করে রাত ।
তারার আলো
কত যে তারা!
ঝিকিমিকি অযুত নিযুত
নক্ষত্রদের বাড়ির নিচে ,
সাগর পাড়ে আগুন জ্বেলে
গান গাইছি।


সেই আগুন সেঁকা ধোঁয়া ধোঁয়া
কাঠকয়লার নেশা নেশা ঘোর গন্ধে;
চোখ বুজছি ।
গান গাইছি।
ছুটে গিয়ে নগ্ন পায়ে
নোনা ফেনায় নূপুর পরছি ।
ফুল গুঁজেছি কানের পাশে
আমার-আমি তাকিয়ে আছে -
অর্ধভেজা আমার শরীর
সব-গা-ভেজা আমার মনের
আনন্দটা দেখতে পেয়ে
দেখার জন্য
নিমগ্ন চোখে
হেলান দিয়ে পাথর থামে
বিমোহিতের নয়ন মেলে -
এমনি ঠায় উপস্থিতি !


বাতাস এসে বলে দিচ্ছে
আজ তোমারই
সময় তিথি
এই এমনটাই হবার ছিল ।
নিজের সঙ্গে দেখা হলে
বিশ্ব জগত এমন লাগে ।
হঠাৎ সবাই তোমার জন্য
তোমায় ঘিরে যজ্ঞ বাঁধে ।। 

মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

অন্ধ চোখে দ্বন্দ্ব বিকোই



সবুজ
বড্ড সবুজ ভালবাসা টের পাই
ইদানিং ।
কেমন তিরতির
কেঁপে কেঁপে ওঠে আমার
চারপাশ।
যেন আমি জানতাম
এ আমার এ বাহুতলে
এ আমারই শূন্য স্থলে
উষ্ণ তরলএক
ভাপ দিয়ে
ভেসে থাকে
চিরন্তন অসীম।

আমি টের পাই।

রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

মৃগ শাবক

বনের বুক চিড়ে
নীরবতাকে সাক্ষী রেখে
হেঁটে যায় যে বনজ পথ;
তার সাথে থাকি
আমি আর
আমার অমন নিরীহ
ছলছল -
এক পৃথিবী নিমগ্ন
চোখ ।।


রবিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯

ছ- হ্রস্বউকার, 'কি' এর পরে

কিছু কিছু দিন আসে
রাতের মত নিঝঝুম।
এসে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে খাটের পাশে ।
মাথার কাছে ।

যেন আমার খুব অসুখ করেছে ।
টেবিলের ওপর রাখা কমলালেবুর নরম অস্তিত্বে
সে তখন 'জীবনানন্দ-বোধ' খোঁজে।

কোন কোন দুপুর সন্ধ্যের মত গোপন।
জানালায় উঁকি দিয়ে আকাশ দেখার মত আপন ।

কিছু কিছু রাত স্বচ্ছ ।
ঠিক কাঁচের মতন ।
বিন্দু বিন্দু জল
গুড়ি গুড়ি স্ট্রীটল্যাম্পের আলোয়
গল্পের ঝুলির মতন।

কিছু কিছু বেলায়
স্মৃতি, বাস্তবতা , স্বপ্ন
সব একরকম ।
ঘোলাটে
গোলাপে
প্রলাপে
তালগোলে
সেঁটে থাকা মন।

কিছু শব্দ বার বার হবার ।
আজীবন বেজে যাবার ।
নীরবতাকে ছাপিয়ে -
কাঁচকলা দেখিয়ে
বিবাগী-উদাস ,
স্থায়ী ।


ভেজা রাস্তা , ভালবেসে
যেমনি বৃষ্টিকে বুকে জড়িয়ে  ধরে,
মেঘের বুঝি তখন প্রশান্তিতে  চোখ বুজে আসে ?!
পাহাড় , পবন , ঝিকিমিকি তারা,
সবাইকে ডেকে ডেকে
চোখের ইশারায়-
কালো পিচের সাথে বৃষ্টির গভীর
প্রণয়কে দেখিয়ে বুঝি মেঘ ঠোঁট চেপে হাসে? স্নেহভরে?



পিচ রাস্তা
অরণ্যের শর্বর , এরা
একই রহস্য পান করা বোদ্ধা ।
যে সুরায় থাকে প্রেম ।
থাকে আদিগন্ত অস্তিত্ব
ধীর গভীর গম্ভীর ।

টিনের চালার ধার চুইয়ে
ঝুলে থাকে যে সদ্য শিশির
গোটা পৃথিবীর উল্টো আয়না হয়ে ,
তাকে এসে আলতো আলিঙ্গন
দেয় সূর্য   ।


সেই সরলতায় কিছু কিছু
দিন বাঁচতে ইচ্ছে করে ।
কিছু কিছু মুহূর্তে
ছ- এর নিচে হ্রস্ব- উকার হয়ে
'কিছু কিছু' সেজে
ঝুলে থাকতে ইচ্ছে করে
শূন্যে ।


কিছু কিছু ।
খুব বেশি নয় ।

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০১৯

চিঠি। কিন্তু কাকে ? তোমাকে না নিজেকেই?



যে তোমাকে নিয়ে আমি উড়ে বেড়াতাম
 আকাশের নীলে বাতাসের ঢেউ হয়ে ,

যে আমরা পৃথিবীর ভৌগোলিক মানচিত্রে
হেঁটে হেঁটে সবুজ পাহাড় , সোনালী সূর্য
দিগন্তের ঘন নীল ছুঁয়ে কল্পনায় ছবি আঁকতাম।

যখন মেলা হবে, শিশু মনে খিল খিল করে
নতুন ওঠা রেশমি চুড়ি ,  ঝাল ফুচকা,
মানুষের কোলাহল ,
গ্যাস এর আগুন ,
হাওয়াই  মিঠাই ,
ষ্টল গুলোর বাহারি নামে
হারিয়ে যেতে যেতে
গল্প করতাম নিজেদের ছোটবেলার।

কখনো বলিনি
কিন্তু আমি মনে মনে আফসোস কুড়োতাম
সেই তোমার মা-হীন ছোট বেলায় কেন আমার
তোমার সঙ্গে দেখা হলোনা।
আমি ঠিক তোমার বন্ধু হতাম।
আমার হাবিজাবি কালেকশন এ ভরা
ছোট্ট লেদারের বাক্সটা  আমি
ঠিক তোমায় খুলতে দিতেম।

তুমি যখন অমন সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ার
গল্পটি বলছিলে,
যে কারণে মাথায় আঘাত পেয়ে তোমার আজ এত
বড়  একটা মস্তিষ্ক জনিত রোগ। মৃগী রোগ।
মনে মনে আমি তখন ছুটে দৌঁড়ে গিয়ে
আঁচল সামলে সিঁড়ি ভেঙে কোলে তুলে নিচ্ছিলাম তোমাকে।
তখন আমি অনায়াসে তোমার মা।
আমি বেঁচে থাকতে কখনো
আমার ছেলে কে চোখের আড়াল-ই হতে দিতেম না।
সিঁড়ি  থেকে গড়িয়ে পড়া তো কত বড় ঘটনা!

তোমার এস. এস.সি.  এইচ.এস.সি.'র রেজাল্ট
ভালো হওয়া না হওয়া
বিদেশে গিয়ে লেখা পড়া শেষ হওয়া না হওয়া
কোনো ভালো চাকরি হওয়া না হওয়া
এগুলো তে মন নেই তো আমার।

ওসব কত টাকা কামাই করা, কত বড় গাড়িদৌঁড়ে বেড়ানো , লোক দেখানো ব্র্যান্ড
এসব কিছু তে নেই তো আমি।
ছিলেম-ই না কখনো।


যখন হঠাৎ লোকেরা এসে বললো
তোমার-ই খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু
যে-  তোমার নাকি নারী-সঙ্গ দোষ আছে।

শুনে আমার একটুও বিশ্বেস হয়নি তো।
কেন হবে?
যখন কিছু দিন পর
আরেক নারীর পাঠানো চিঠি
তোমার সঙ্গে হোটেলে থাকার অন্তরঙ্গ
ছবি , সুইমিং পুলে , হেসে দাঁড়িয়ে
জড়িয়ে ধরে, ভালোবেসে, পানিতে ডুবে গিয়ে ,
সমুদ্রের বালুতে আঁকা নিজেদের প্রতিচ্ছবি।


তখনও তো বিশ্বেস হয়নি আমার!
কেন হবে!

যখন তোমার মেয়ে বান্ধবী আমাকে লিখে পাঠায়-
আমার সাথে বিয়ের মাস খানেক এর পর থেকেই তুমি নাকি
অসুখী।
অথচ। ...
ঠিক তক্ষুনি সেই মেয়ের চিঠি পড়তে পড়তে স্মৃতিতে আমার ভাসছে  -

রাত জেগে তারা দেখতে দেখতে শব্দ-শব্দ খেলায়
যখন ভীষণ মজে গেছি। আমরা একদিন।
তুমি হঠাৎ খেলা থামিয়ে দুম করে জানতে চাইলে,
মরে  গেলে আমি, আমার কবর কোথায় চাই।
যথার্থ কারণে আমার উত্তর টা ছিল "আমার বাবার পাশে।"
শুনে তুমি বললে, "আচ্ছা তাহলে তো আমাকে আমার বাপ-দাদার
পারিবারিক কবর ছেড়ে তোমার শহরে এসে কবর করতে হবে।"
আমার 'কেন' প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলে তুমি ,
"আমি কি করে থাকবো মৃত্যুর পর তোমাকে ছেড়ে আলাদা?
পৃথক দুটি শহরে। দুজনে ?"

তখন আমি মনেমনে, মস্তিষ্কে,  মাথায়, হৃদয়ের রক্তপাতে ভেসে লাল ক্ষত- বিক্ষত স্মৃতি হাতড়িয়ে হিসেবে করছি। ..এ কথা টা তো তোমার বিয়ের এক বছরেরও পরে বলা...তাহলে বিয়ের কয়েক মাস পর....যা বলেছে মেয়েটা।...


পরে।  কিছুদিন পর যখন জানা গেলো আমাকে নিয়ে যা- তা রটিয়ে বেড়াচ্ছ তুমি।
যা নয় তাও। যা ছিল গোপন।  শুধু দুজনার তাও।
যা ছিল বিড়ম্বনার কিন্তু নিজস্ব আপন তাও।
যা ছিলোনা। কোনোদিন ঘটেনি।  তাও।


তখন মনে মনে , বিশ্বাস করো
আমি কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম।
নিজের ভিতর ঢুকে পড়ে আরও আড়ষ্ট
হচ্ছিলাম এই বোধ থেকে নয় যে আমার কথা লোকে কি ভাববে।
লোকে কি ভাবছে।
বরং এই থেকে, এই  বোধ থেকে যে
পৃথিবী তে যে মানুষটিকে সবচাইতে আপন, কাছের।  সম্মানের।
আদরের।  শ্রদ্ধার। বিশ্বাস এর উঁচু আসনে আমি বসিয়ে ছিলাম আমার মা বাবার পর।
বন্ধুত্বের।  আহল্লাদের। অরণ্যের।  নদীর।
একটা গড়িমসি অলস সকালের অভ্যস্ততার মতো করে।

উল্টো জামা ছেঁড়া টি-শার্ট পরে ঘরময় হেঁটে বেড়ানোর কিংবা না বেড়ানোর
মতো আরামের যে সহজ সুন্দর সম্পর্কের একটা মাঠে দিব্যি আমার মন
এক্কা  দোক্কা খেলে বেড়াচ্ছিল।

সেই মানুষটাকে আমার চোখে এত টা নিচে নেমে যেতে দেখাটা আমি
বিশ্বেস  করতে পারিনি। এ হতেই পারেনা!
যে মানুষ আমার সাথে দিনের পর দিন অন্য কে শ্রদ্ধা করার, সম্মান দেবার নানা রকম উদাহরণ নিজের অজান্তে দিয়ে গেছে।  তাকে কি করে আমি ছোট হতে দেখতে পারি!

মাঝে মাঝে আমি আমার ঘর থেকে বেরুই।  বেরিয়ে ঘরের সামনে খোলা আকাশের দিকে হা করে চেয়ে থাকি।

ঠিক যেমন টা হা করে শুনেছি আমি তোমার মুখে বলা স্বরচিত, মিথ্যে, আধা-মিথ্যে গল্প গুলো আমাকে নিয়ে।

আমি কোনো উত্তর পাইনি সেদিন।  আজও  পাইনা।
আকাশ শুধু আমার সামনে তার অনন্তের ক্যানভাসটা  মেলে ধরে আমার অবাক হবার ব্যাপ্তিটুকু  তুলে ধরে আমার সাথে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
হয়তো একেই বন্ধুত্ব বলে।  হয়তো একেই সম্মান বলে।  ভালোবাসা বলে।
নিঃশব্দে থেকে শুধু পাশাপাশি সহ- অবস্থান করে যে আপন হওয়া। তা সত্যি-ই কোথাও গিয়ে আকাশের মতো বিশাল একটা সম্পর্কই। বড্ড 'ক্লিশে'  শোনায় যে কথা গুলো- সেগুলোই  নতুন করে উপলব্ধি করছি।

"তুমি যদি আমার সাথে আমার মৌনতাই না ভাগাভাগি করে নিতে পারো ,
তাহলে তুমি আমার কথা গুলো , ভাবনা গুলো কিভাবে ভাগাভাগি করে নেবে?!"

নতুন করে জীবনকে যেন শিখছি, জানো?
মূল্যবোধ আশা-প্রত্যাশা।  আদান-প্রদান।  সমঝোতা।
এসব আবার হাঁটি হাঁটি পা পা করে শিশুর মতন শিখছি। এ এক নতুন বর্ণ পরিচয়ে,  জানোতো ?

কি জানি আজকাল একটা শিশুকেও বিশ্বাস করতে ভয় পাই।  কারো সঙ্গে বেশিক্ষণ সময় কাটাতে ভয় পাই।
কেউ আগ বাড়িয়ে কৌতূহল দেখালে গুটিয়ে যাই।  দৌঁড়ে পালাই।

এসব গুটিয়ে চলতে চলতে।  দৌঁড়ে  পালাতে পালাতে যখন আবার নিজের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াই । আকাশটার  নিচে।
তখন একদিন হঠাৎ সন্ধ্যায় লক্ষ্য করি, আমার এই পালানোটা  আসলে কার থেকে?
কিসের থেকে?
আমি তো আসলে তোমায় এখনো ভালোবাসি।
এখনো বুক জুড়ে সেই টনটন ব্যাথাটা একইরকম বিষ ছড়ায়। সুখ দেয়।
বুকের খাঁচা ছিঁড়ে বের হয়ে আসতে চায় তোমার অবহেলিতো আমি। আমার আর্ত চিৎকার-  "ভালোবাসি  এখনও " ।

তবু এ স--ব কিছু ছাঁপিয়ে , সব কিছু উজাড় করে বাতাসে শুকনো কান্না, ভেজা শ্বাস মেলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকি।
দাঁড়িয়ে থেকে আমি দেখি।  যা রয়ে গেছে ভিতরে, তা এখনো শুধুই এক অতি নিষ্পাপ প্রেম।
একটা সূক্ষ্ণ শুদ্ধ অনুভূতি। একটা স্বর্গ।

আর তাই বলেই হঠাৎ আমি আবিষ্কার করি, মনের ভিতর জুড়ে আমার বসবাস ক্ষমার।
কোনো জেদ নেই।  ক্ষোভ নেই। অভিযোগ নেই। হিংসা-প্রতিহিংসা নেই। রাগ নেই।
দুঃখ নেই।

শুধুই ক্ষমা। আমি ক্ষমা করি আমাকে। তোমাকে।  ওই অঞ্জন এর গান এর মতো মনে পড়ে-
"আমার আকাশ কুসম স্বপ্ন দেখার
খেলা থামেনি।
শুধু তুমি চলে যাবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি!"

ক্ষমা করি এই অপ্রস্তুতির  জন্য নিজেকে । ক্ষমা করি নিজেকে তোমাকে আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য বোকা বোকা সব কান্ড-কীর্তি ,  কথা তৈরির জন্য।  ক্ষমা করি আমি আমায়। ক্ষমা করি আমি তোমায়। যখন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো তখন গিয়ে তো অন্য কে ক্ষমা করা যায়।
অক্সিজেন অন্য কে দেবার আগে নিজের ফুসফুসে তো আগে নিতে হয়, সেই অন্য কে বাঁচাবার প্রয়োজনেই।

তাই এই আমার ছোট্ট এক টুকরো পাহাড়ের, সমুদ্রের পাশের ঘর।  এই ঘরের বাইরের  মাঠে দাঁড়িয়ে। আকাশের দিকে তাকিয়ে পাহাড় সমুদ্র সাক্ষী রেখে-

আমি ক্ষমা করছি আমাকে। আমি ক্ষমা করছি তোমাকে। আমি ক্ষমা করছি সকল প্রাণী।  সকল মানুষ কে যারা আমাকে জেনে না জেনে কষ্ট দিয়েছে। আমি কষ্ট দিয়েছি। আমি কষ্ট পেয়েছি  ভুল বুঝে।

ভালো থাকি আমি।  ভালো থেকো তুমি। ভালো থেকো তোমরা। ভালো থাকুক তারা।
পৃথিবী উত্তাল হউক শুধু ভালোবাসায়। শুধুই আশীর্বাদে।  শুভকামনায়।  শান্তিতে।
প্রশান্তি তে। ক্ষমায়। মুক্তি তে।

আমীন।।